শরতের দ্যুতি

শরৎ ঋতুর বর্ণিল সাজ
শরৎ ঋতুর বর্ণিল সাজ

আমাদের দেশ ষড়ঋতুর দেশ। ঋতুর রাণি শরৎ বিধাতার কারুকাজে সাজানো প্রকৃতির রুপে ভরপুর রুপসী ঐন্দ্রজালিক ঋতু। বর্ষার শেষে এই এক মেদাহীন কোমল সুস্নিগ্ধ আলতো শিশিরভেজা ঋতু রাণি শরৎ। মাঝে মাঝে হঠাৎ এক পশলা বৃষ্টি, রোদ নেই, খানিক পরে বৃষ্টি আর নেই সূর্যটি তার জৌলুস বাড়িয়ে আলোকিত করে পৃথিবী।
ভাদ্র-আশ্বিন দুমাস শরৎকাল। শরতে কালো মেঘের ঘনঘটা থাকেনা। অঝোরে ঝরেনা বাদর। এ সময় গ্রামের কৃষকরা মাঠে নতুন ধানের চারা লাগায়। মাঠে-ঘাটে সবুজের চাদর বিছিয়ে দেয় শরৎ। গাছগুলো নতুন তরতাজা সবুজ পাতায় সাজে। গ্রামগুলো যেন একটা স্বচ্ছ সবুজ আয়না। গাছে গাছে পাখিরা গান করে। আকাশ নীল শাড়িটি পরে তুলোটে মেঘ বুকে নেয়। কৃষকরা জমি চাষ করে, মই দেয়, জমিতে মই দেয়ার সময় পানিগুলো ঢেউয়ের মত উতরিয়ে এপাশ থেকে ওপাশে গড়ায়। আর তখন মাছ ধরার জন্য গ্রামের ছোট খোকা-খুকিরা ছাই, জাল, চালন নিয়ে কাঁদা পানিতে নামে। তারা মনের আনন্দে মাছ ধরে হৈ চৈ করে গায়ে কাঁদা মেখে দিন কাটায়। নদী-নালা, বিল-ঝিল, দীঘি, পুকুর ডোবা পানিতে টইটম্বুর থাকে। এসব নদী-নালা, বিল-ঝিল, দীঘি, পুকুর ডোবায় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ থাকে। মাছ ধরার জন্য বাঙালি কিশোর-কিশোরীদের পাশাপাশি মাছরাঙা, ডাহুক, দোয়েল, বক, চিল, সাপ, গুইসাপের শিকার ধরার দৃশ্য চোখে পড়ে। পাখিরা মাছ ধরে নিয়ে বাচ্চাদের খাওয়ানোর জন্য বাচ্চাদের মুখে নিজের মুখটি ডুকিয়ে দেয়। শরতের এসব দৃশ্য মনকেড়ে নেয় বাংলার মানুষের। প্রকৃতির দোলা লাগে মানুষের মনে, ভুলোমনে পথ হারায় পথিক।
শীতকালীন সব্জি- লাউ, শিম, কুমড়া দেঁড়স ইত্যাদির বিজ রোপণ করে এই শরতে। আর এসব বিজ হতে গাছ জন্মে। কচি গাছের নতুন দুটি পাতায় শিশির জমিয়ে দেয় শরতের ভোররাত।
শরতে রাতের দৃশ্য খুবই নয়নাভিরাম। শরতের রাতে চাঁদের জ্যোৎস্না ঢেউ খেলে যায় সারাটি রাত। এমন চাঁদনি রাতে কিশোর-কিশোরী কানামাছি খেলে, আর লুকোচুরি খেলা খেলে, গাঁয়ের বধূরা জ্যোৎস্নায় গা ডুবিয়ে নেয়। কিষাণ বধূরা দুর্বা ঘাসের পথ মাড়িয়ে জ্যোৎস্নায় স্নান করে। বধূদের পাদুকা শিশির ভেজা ঘাসের সাথে ঘষে ছপ ছপ মৃদু শব্দ তোলে। ছোট্টমনি চাঁদ আর আকাশের তারা দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়ে জননীর কোলে। গ্রামের কিশোর-কিশোরীরা জোনাকি ধরার জন্য জোনাকির পিছনে পিছনে দৌড়ে এবাড়ি থেকে ওবাড়ি, এখান থেকে ওখানে ছুটে। আকাশে তুলোটে মেঘ নীল চাদরের নীচে ভেসে যাচ্ছে অজানার দেশে। তাদের সুধালে মেঘগুলো বলে যেন- যাচ্ছি শরতের বেশে। শরতের সাদা পোশাকে মেঘের আনা-গোনা দেখে আমাদের মনে উদাসির বাঁশি বাজে। উঠোন পেরিয়ে ঘরে ঢোকা চায়না আমাদের মন। মানুষের মন হারিয়ে যায় অপরুপ এই শরতের খেলায়। এদিনের দৃশ্য মিশে জমে রয় হৃদয়ের পরতে পরতে আগামির শরতে।
ঋতুরাণি শরৎ শ্রষ্টার নৈসর্গিক সৃষ্টি। নীল আকাশের নিচে সবুজ ছায়ায় দোয়েল শ্যামা পাখিরা গান গায়। গ্রামের মেঠো পথ ধরে চলতে চলতে এগুলেই সাদা সাদা কাশফুল নাচতে নাচতে পথিকের গা ছুঁয়ে অনাবিল আনন্দের জাদুর পরশ লাগিয়ে দেয়। পথিক কাশফুলের কাছাকাছি গিয়ে থমকে দাঁড়ায়, কাশফুল নুয়ে পড়ে পথিকের গায়, পথিক মিনতি নেয়।
বাড়ির উঠোনের ধারে ফুলেরা গন্ধ ছড়ায়। সাথে ভেসে আসে মুয়াজ্জিনের আযানের ধ্বনি। শিউলি, দোলনচাঁপা, টগর, জুঁই, চামেলি, হাসনাহেনা গাছ যেখানে সেখানে বাঙালি কিশোরী ঐশী শৈলী অর্থী জেবাদের রাত পোহায়। আর প্রিয় শরৎ তখন মৃদু বাতাসে ফুলের সুবাস মেখে স্নিগ্ধরুপের মায়ায় আমাদের জড়ায়। পুব আকাশে রক্ত রবি রাত শেষে দিনের আঁচলপাতে। সূর্যের আলোয় সবুজে মাঠ-প্রান্তর রেদেলাঝিলিক পরিয়ে দেয় আমাদের চোখে। মাঠে মাঠে ধানের নব-চারা। দীঘি, পুকুর, ডোবায় শাপলা ফুল ভাসে। পানিতে পানকৌডির বাচ্চাগুলো শাপলা পাতার নীচে গা লুকোয়। বাচ্চাগুলো তাদের মা-বাবার অপেক্ষায় এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে মা-বাবা আসছে কিনা। মেঘে আড়াল থাকে শরতের বর্ণিল আকাশ, ঘাটে পালতোলা নৌকা, মেঘগুলো ডানা মেলে সাদা পরির বেশে নীল চাদরের নীচে নেমে আসে। নীল জোনাকি পিদিম জ্বালায়, ঝি ঝি বসায় গানের আসর, ফুলগুলোসব মধুর সুবাস ছড়ায়, আমাদের মন কাড়ে শরৎ ঋতুর প্রকৃতি। বর্ষার বিদায় জানায় এ ঋতু। এই শরৎ ঋতুর বর্ণিল সাজ আমাদের সমস্ত বিষন্নতা দুর করে।

লেখক: আবদুর রউফ পাটোয়ারী।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here