চীন-ভারতকে সঙ্গে রেখেই চলতে চায় সরকার

ভারত.চীন.বাংলাদেশ-ছবি ইন্টারনেট থেকে
ভারত.চীন.বাংলাদেশ-ছবি ইন্টারনেট থেকে

সম্প্রতি বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিবেশী ভারতের সম্পর্ক ভাটার দিকে বলে বিশ্লেষকদের ইঙ্গিতের প্রতিধ্বনি মিলেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যেও। দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে পেছনের যেসব কারণ উঠে এসেছে তার মধ্যে অন্যতম রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতকে বাংলাদেশের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়ে পাশে না পাওয়া, দ্বিতীয় কারণ দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত তিস্তা ইস্যুর মীমাংসা না হওয়া ও সর্বশেষ সীমান্ত হত্যা। একাধিক নেতার দাবি, প্রধান ৩কারণ ছাড়াও আরও কিছু কারণে সম্পর্কে কিছুটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বাংলাদেশ ভারত সম্পর্ক ঐতিহাসিক ও পুরনো। সুতরাং সম্পর্ক শিথিল হলেও এটা নষ্ট হওয়ার নয়। তিনি বলেন, আমাদের পররাষ্ট্র নীতি হলো সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়। এই নীতি অনুসরণ করেই এগিয়ে যাচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। তিনি বলেন, বন্ধু রাষ্ট্র চীন আমাদের অবকাঠামো উন্নয়নে বেশ ভূমিকা রাখছে। চীনকে আমরা বন্ধু হিসেবে নিয়ে পথ চলছি। এটাও ভারতের পক্ষ থেকে এক ধরনের অসন্তোষ তৈরি থাকতে পারে। এই নেতা বলেন, ভারতের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। ইন্টারকানেক্টিভিটি বেড়েছে। এই নেতা আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও বিশ্বাস করেন সম্পর্ক নষ্ট করে পররাষ্ট্রনীতি এগিয়ে যেতে পারে না। তাছাড়া সর্বোপরি দেশের স্বার্থই শেখ হাসিনার কাছে মুখ্য। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে যেমন ঐতিহাসিক সম্পর্ক অটুট থাকবে তেমনি বন্ধু রাষ্ট্রকেও সঙ্গে নিয়ে পথ চলতে হবে ও দেশ পরিচালনা করতে হবে। শেখ হাসিনার এই নীতির ফলে দেশে বিদেশে গুঞ্জন শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। আলোচনা এমন দিকে গড়িয়েছে চীনের দিকে ঝুঁকছে না তো বাংলাদেশ!

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন এ প্রসঙ্গে বলেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ঐতিহাসিক, টেকসই ও বহুমাত্রিক। এই সম্পর্ক শিথিল হওয়ার নয়। তারা যেমন আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশও একই রকম। এই মূল সত্য দুই দেশ কখনো ভোলে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন বলেন, গ্লোবাল রাজনীতির ধরন অনেকখানি পাল্টে গেছে। এখন একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রাখব আরেকটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে না সেই জায়গায় ভূরাজনীতি এখন নেই। তাছাড়া বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিও সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়। সরকার এই নীতিতে পথ চলছে বলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে দেশি-বিদেশি গুঞ্জন সৃষ্টি হয়েছে। অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন বলেন, নানা কারণে সম্পর্ক কখনো শিথিল হতেই পারে কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে, তবে তার মানে এই নয় যে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। এটা সম্ভবও নয়। আবার চীনের সঙ্গেও সুসম্পর্ক থাকতেই হবে আমাদের।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর আরেক সদস্য বলেছেন, প্রচলিত পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা এগিয়ে যাবেন। এখানে কোনো দেশের ভুল বোঝাবুঝি শেখ হাসিনার সরকারের কাছে গুরুত্ব পাবে না। প্রধানমন্ত্রীর কাছে সর্বাগ্রে প্রাধান্য পাবে দেশের স্বার্থ। এই নেতা বলেন, দেশের মঙ্গল যেভাবে নিশ্চিত হবে শেখ হাসিনা সেই পথ থেকে বিচ্যুত হবেন না। আবার কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্টও হবে না। এই ক্ষেত্রে তিনি সর্বোচ্চ কৌশলী অবস্থানে সামনের দিকে পাড়ি জমাবেন। এই নেতা আরও বলেন, সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্র সচিব শ্রিংলা বাংলাদেশ সফরে এলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে গুঞ্জন উঠেছে। তবে এই গুঞ্জন বেশিদূর গড়াবে না। দলের সম্পাদকমন্ডলীর এক সদস্য বলেন, দলের সর্বশেষ একটি কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় ভারত ও চীনের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা উঠলে প্রধানমন্ত্রী পরিষ্কার বলেন, প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত আমাদের অকৃত্রিম ও পরীক্ষিত বন্ধু। ঐতিহাসিক এই সম্পর্ক কোনো কিছুতেই দুর্বল হবে না। আবার কোনো বন্ধু রাষ্ট্রের সঙ্গেও বৈরী সম্পর্ক থাকবে না।

দলের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ফারুক খান বলেন, পৃথিবীর যেকোনো দেশের সঙ্গে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কিছু ভুল বোঝাবুঝি, সমস্যা থাকে। সে হিসেবে আমাদেরও সমস্যা ভুল বোঝাবুঝি থাকতে পারে। কারণ এগুলোতে দুই দেশের স্বার্থ জড়িত থাকে। তিনি বলেন, তবে এর মানে এই নয় যে, ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক নষ্ট হচ্ছে বা হবে। ফারুক খান বলেন, গত দশ বছরে ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক গভীর ও শক্তিশালী হয়েছে। কিছু সমস্যা যেমন তিস্তা চুক্তি, রোহিঙ্গা ইস্যুতে কিছু ভুল বোঝাবুঝি এসব। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ভারতকে নিয়ে সবসময় কিছু মানুষ আছে খেলে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে ফোন দেয়া, লাদাখ নিয়ে যে ঘটনা এরপর কিছু মানুষ এগুলোকে বড় করে দেখিয়ে সমস্যা বাধানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, এর মানে এই নয় যে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়বে বাংলাদেশ। আবার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করব তাও নয়। ফারুক খান বলেন, পররাষ্ট্রনীতি অনুযায়ী ভারসাম্য রক্ষা করেই আমরা চলব। তবে এটা এক রকম চ্যালেঞ্জ। ফারুক খান বলেন, ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের বাংলাদেশ সফর ইতিবাচক। প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের যেমন ভারতকে প্রয়োজন, তেমনি ভারতেরও বাংলাদেশকে প্রয়োজন। সুতরাং তিক্ততা সৃষ্টি হবে না। আমাদের পররাষ্ট্রনীতি যেহেতু সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়, সে হিসেবে আমাদের পথচলা।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here