করোনা ভ্যাকসিনের সম্ভাব্য উচ্চমূল্য ভাইরাসের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক লড়াইকে জটিল করবে

করোনা ভ্যাকসিনের সম্ভাব্য উচ্চমূল্য ভাইরাসের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক লড়াইকে জটিল করবে
করোনা ভ্যাকসিনের সম্ভাব্য উচ্চমূল্য ভাইরাসের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক লড়াইকে জটিল করবে

মহামারি করোনাভাইরাসের কোনো ভ্যাকসিন নেই এবং সবচেয়ে বেশি পরিচিত ওষুধটির নাম রেমডেসিভির, যা কিনা হাসপাতালে সেরে ওঠার সময় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে এবং নির্দিষ্ট ধরনের কিছু রোগীর জন্য এটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে।কভিড-১৯-এর সংক্রমণ বৃদ্ধির ফলে যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বব্যাপী সবাই এমনকি ধনীরাও প্রথমবারের মতো বুঝতে পেরেছে যে যদি তারা অসুস্থ হয়ে পড়ে তবে বেঁচে থাকার জন্য কোনো ওষুধ নেই।
করোনাভাইরাসে আক্রান্ত গরিব মানুষের প্রয়োজনীয় ওষুধ পেতে সাধারণত বেশ ঝামেলা পোহাতে হয়। এমনকি যখন ভালো মানের ওষুধ তাদের সুস্থ করতে প্রস্তুত থাকে তখনো।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যেখানে স্বাস্থ্যের কোনো আইনি অধিকার নেই, মেডিকেল চিকিৎসার জন্য সাধারণ বীমার প্রয়োজন হয়। রেমডেসিভিরের ছয় শিশির একটি কোর্স সম্পন্ন করার মাধ্যমে চিকিৎসায় খরচ হয় ৩ হাজার ২০০ ডলার। যদিও সমালোচকরা যুক্তি দেখিয়ে বলছেন, এর প্রস্তুতকারক গিলিয়েড চাইলে আরো কম মুনাফা করতে পারে। আন্তর্জাতিকভাবে ওষুধের উচ্চমূল্যের অর্থ হলো, এসব ওষুধ কেবল ধনীরা ব্যবহার করতে পারবে।

করোনার রোগীরা ওষুধ পাওয়ার এ বিষয়টি অন্য অর্থে বললে, এটি সাধারণ নৈতিক সমস্যার ব্যাপার, বৈজ্ঞানিক নয়। আর এটি করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক লড়াইকে আরো জটিল করে দেবে। অনেক বিশেষজ্ঞ উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিনের উচ্চমূল্য হওয়ার আশঙ্কা আছে এবং এর ফলে এটি খুবই অসমভাবে দেশগুলোর মাঝে বিতরণ করা হবে। যা করা হবে মূলত ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে।

একটু কল্পনা করেই এই চ্যালেঞ্জ উতরে যাওয়া যেতে পারে। আমি আমার নতুন বই গ্লোবাল হেলথ ইমপ্যাক্ট: এক্সটেন্ডিং এক্সেস টু এসেনশিয়াল মেডিসিনে দেখিয়েছি কিভাবে অতীতের মহামারী পোলিও, ইবোলা থেকে এইচআইভি পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রোগীদের জন্য জীবন রক্ষাকারী ওষুধ পেয়েছে, তারা কোথায় থাকে কিংবা তাদের আয় কি সেটা বিবেচনার কোনো বিষয়ই ছিল না।

এইচআইভির কার্যকর চিকিৎসা চিহ্নিত করতে বিজ্ঞানীদের বহু বছর সময় লেগেছে। কিন্তু ১৯৯৭ সালের মধ্যে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল ওষুধের কারণে আক্রান্ত বেশির ভাগ রোগী দীর্ঘ ও অর্থপূর্ণ জীবন যাপন করতে শুরু করে। এদিকে এ রোগটি এখনো প্রতি বছর সাব-সাহারান আফ্রিকায় ২.২ মিলিয়ন মানুষকে হত্যা করছে। কারণ ওষুধ কোম্পানিগুলো দাবি করেছে যে অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল ওষুধের জন্য প্রতিজন রোগীর বার্ষিক ব্যয় ১০ থেকে ১৫ হাজার ডলারের নিচে নামানো অসম্ভব।

প্রতিক্রিয়ায় মানবাধিকার কর্মীরা এইডস নিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রচার অভিযান শুরু করে। তারা অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল নিয়ে আফ্রিকান রোগীদের শেখাতে শুরু করে। এছাড়া চিকিৎসা এবং এমনকি ওষুধ কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে মামলা করার জন্যও তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা করে। শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকা এবং আরো অনেক জায়গায় গণপ্রতিবাদ শুরু হয়, যা ওষুধ পাওয়ার বিষয়ে জনমতকে বদলে দেয়।

২০০০ সালের মধ্যে জেনেরিক ড্রাগ প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলোর প্রতিযোগিতা অ্যান্টিরেট্রোভাইরালগুলোর মূল্য প্রতিজন রোগীর জন্য বছরপ্রতি ৩৫০ ডলারে নামিয়ে নিয়ে আসে এবং লাখো মানুষকে ওষুধ পাওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেয়।

প্রায় একই সময়ে কাছাকাছি ধরনের গল্প দেখা যায় টিবি রোগের ক্ষেত্রেও। যা ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপকভাবে হ্রাস পেলেও অন্য অনেক জায়গায় ক্রমশ মারাত্মক হয়ে ওঠে। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন, আফ্রিকা ও এশিয়ায় ড্রাগ প্রতিরোধী স্ট্রেইনের উত্থান ভয়াবহ এক চ্যালেঞ্জের বিষয়ে পরিণত হয়।

প্রচলিত একটি ধারণা মানুষের মাঝে চালু ছিল যে ড্রাগ প্রতিরোধী টিবি থেকে বাঁচানো যায় না। ওষুধ ছিল বেশ দামি, চিকিৎসার সময়কালও ছিল দীর্ঘ এবং রোগ পরিচালনাও বেশ জটিল বিষয়। এরপর পার্টনার ইন হেলথ নামে একটি সংস্থা তখনকার সময়ে বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ পেরুতে ৫০ জন টিবি রোগীকে চিকিৎসা করে এই অজুহাতকে ভুল প্রমাণ করে।

এই প্রকল্পটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে বহু ওষুধ প্রতিরোধী টিবি চিকিৎসার অনুমোদন দিতে সহায়তা করেছিল। টিবি চিকিৎসায় বৈশ্বিক অর্থায়নও বড় আকারে বৃদ্ধি পায় এবং জেনেরিক মেডিসিনের উৎপাদনও। বর্তমানে ওষুধ প্রতিরোধী টিবিতে আক্রান্ত ৭০ শতাংশ রোগী চিকিৎসা লাভ করছে।

স্বাস্থ্যবিষয়ক এই প্রচারগুলো উভয়ই সেই গুণকে প্রদর্শন করে যাকে আমি সৃজনশীল সমাধান বলতে পারি। যা কিনা ট্র্যাজেডি কাটিয়ে ওঠার মৌলিক প্রতিশ্রুতি।
অন্য উদাহরণগুলোতে ১৯৬০-এর দশকে ‘রিং ভ্যাকসিনেশন’ও অন্তর্ভুক্ত আছে। সে সময় গণভ্যাকসিনেশন কার্যক্রম বসন্ত রোগ থামাতে না পারলে একটি কন্টাক্ট ট্র্যাকিংভিত্তিক টিকাদান কৌশল গ্রহণ করা হয়।

কভিড-১৯-এর ওষুধে অসম বিতরণ কেবল নৈতিক সমস্যা নয়। এটা বৈশ্বিক মহামারী। একটি অঞ্চলের প্রাদুর্ভাব তাই সবাইকে হুমকিতে ফেলতে পারে।যদিও কভিড-১৯-এর ক্ষেত্রে দেখানোর জন্য কিছু সৃজনশীল সমাধান রয়েছে। যেমন জাতিসংঘ সমর্থিত সংস্থা মেডিসিন পেটেন্ট পুল উদ্ভাবনের গতি বাড়ানোর জন্য কোম্পানিগুলোকে তাদের পেটেন্ট ভাগ করে নিতে উৎসাহিত করে। এটি কভিড-১৯-এর ওষুধ আবিষ্কার ও গবেষণার কাজকে এগিয়ে নিচ্ছে।

অনেক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ নতুন ওষুধ বিতরণ পদ্ধতি প্রস্তাব করছেন। যার ফলে ওষুধ ও ভ্যাকসিন পাঠানো যাবে যেখানে তাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
বৈশ্বিক করোনাভাইরাস মহামারী দূর করতেও একই রকম সৃজনশীল সমাধান প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের কভিড-১৯-এর প্রতিশ্রুতিশীল ভ্যাকসিন প্রাথমিকভাবে লাভ করতে ১.২ বিলিয়ন ডলার প্রদান করতে সম্মত হয়েছে এবং একইভাবে ফ্রান্সের ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি সানোফির তৈরি ভ্যাকসিনের প্রথম প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে চেয়েছিল। যা দুই দেশের নাগরিককে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। এ ধরনের চুক্তি ব্রাজিল, মিসর ও ভারতের মতো প্রস্তুতকারক দেশগুলোর জন্য ক্ষতিকর, যাদের নাগরিকদের তাদের কারখানায় তৈরি ওষুধে খুব কমই অভিগম্যতা রয়েছে।স্ক্রলডটইন

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here