অ্যান্ড্রু কিশোর না থাকলেও পূর্ণিমাতে ভাইসা যাবে নীল দরিয়া

অ্যান্ড্রু কিশোর
অ্যান্ড্রু কিশোর

কণ্ঠ সম্রাট অ্যান্ড্রু কিশোরের সেই কথাটিই সত্য হলো, অ্যান্ড্রু কিশোর না থাকলেও ‘পূর্ণিমাতে ভাইসা যাবে নীল দরিয়া’ তিনি নীল দরিয়াকে সাক্ষী রেখে পাড়ি জমালেন না ফেরার দেশে। সোমবার (৬ জুলাই) সন্ধ্যায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বাংলা চলচ্চিত্রের এই কিংবদন্তী। অ্যান্ড্রু কিশোরের পারিবারিক বন্ধু সুরকার ইথুন বাবু তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন।ইথুন বাবু বলেছেন, রাজশাহী কোর্ট এলাকায় এন্ড্রু কিশোরের বোনের একটি ক্লিনিক আছে। সিঙ্গাপুর থেকে ফিরে সেখানেই ভর্তি ছিলেন তিনি। সোমবার সন্ধ্যা ৬টা ৫৯ মিনিটে সেখানেই মারা গেছেন তিনি। রাজশাহী চার্চের কবরস্থানে তাকে সমাধিস্থ করা হবে বলে জানিয়েছেন ইথুন বাবু ।

‘প্লেব্যাক সম্রাট’ অ্যান্ড্রু কিশোর ১৯৫৫ সালের ৪ নভেম্বর রাজশাহীতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। রাজশাহীতে কেটেছে তার শৈশব-কৈশর। এক সময় গানের নেশায় রাজধানীতে ছুটে আসেন। অচেনা এই শহরে শুরু হয় তার গানের যুদ্ধ। ক্লান্তিময় পথ পেরিয়ে নিজেকে তিনি একজন জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন। একে একে অনেক কিছুই তার কাছে ধরা দিয়েছে প্রথম হয়ে।

বাংলাদেশের সঙ্গীত জগতে অ্যান্ড্রু কিশোর এক অপ্রতিদ্বন্দ্বি নাম। গত তিন দশক ধরে বাংলাদেশে চলচ্চিত্রের গানে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছেন তিনি।অ্যান্ড্রু কিশোরের গাওয়া অসংখ্য জনপ্রিয় গান মানুষের মুখে মুখে। উত্তরাঞ্চলীয় জেলা রাজশাহীতে বেড়ে ওঠা এই গায়ক আটবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার পেয়েছেন। তিনি বাংলাদেশ ও অন্যান্য দেশের বহু চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। তাঁর সবচেয়ে জনপ্রিয় গানের মধ্যে রয়েছে, হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস, ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে, আমার সারা দেহ,”আমার বুকের মধ্যে খানে” প্রভৃতি। ১৯৮২ সালে তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। তার অন্যতম গান হলো জীবনের গল্প আছে বাকি অল্প।

এন্ড্রু কিশোর আব্দুল আজিজ বাচ্চু অধীনে প্রাথমিকভাবে সঙ্গীত পাঠ গ্রহণ শুরু করেন। মুক্তিযুদ্ধের পর কিশোর নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, আধুনিক, লোক ও দেশাত্মবোধক গান শ্রেণী রেডিও মধ্যে তালিকাভূলক ছিল। তার প্রথম গাওয়া গান হল আলম খান সুরারোপিত চলচ্চিত্র ‘প্রতীক্ষা’, সিনেমা থেকে ‘এক চোর যায় চলে’। তিনি অন্যান্য প্লেব্যাক গান রেকর্ড করেন যেমন ‘ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে’, ‘ভালবেসে গেলে শুধু’ এর মত জনপ্রিয় সব গান। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর, কিশোর নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, আধুনিক, লোক ও দেশাত্মবোধক গান শ্রেণী রাজশাহী বেতার সঙ্গে তালিকাভূক্ত ছিল। কিশোর এছাড়াও টিভি নাটক, বাণিজ্যিক এবং অন্যান্য প্রযোজনার উত্পাদন করে যা তার প্রবাহ মিডিয়া নামের একটি প্রোডাকশন হাউস কাজ করেন।অ্যান্ড্রু কিশোরের দুটি সন্তান রয়েছে। প্রথম সন্তানের নাম সঙ্গ্গা আর দ্বিতীয় জনের নাম সপ্তক।
এন্ড্রু কিশোর এছাড়াও একজন ব্যবসায়ী হয়। ১৯৮৭ সালে তিনি বরাবর আহমাদ ইউসুফ, আনোয়ার হোসেন বুলু, ডলি জহুর, দিদারুল আলম বাদল, শামসুল ইসলাম নান্টু সাথে একটি বিজ্ঞাপন প্রতিষ্ঠান ‘প্রবাহ’ শিরোনামে উদ্বোধন করেন।
এন্ড্রু কিশোরের গাওয়া জনপ্রিয় সিনেমা সমূহ-১৯৯২ – শঙ্খনীল কারাগার, ১৯৯৪ – সুজন সখি, ১৯৯৪ – অন্তরে অন্তের, ১৯৯৫ – দেনমোহর।
চলচ্চিত্রে নিয়মিত প্লেব্যাকের পাশাপাশি সম্প্রতি শেষ হওয়া সঙ্গীতবিষয়ক রিয়েলিটি শো বাংলাদেশী আইডলের বিচারক ছিলেন এ জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী।

অ্যান্ড্রু কিশোর
অ্যান্ড্রু কিশোর

দীর্ঘদিনের ক্যারিয়ারে সুখ-দুঃখ, হাসি-আনন্দ, প্রেম-বিরহ সব অনুভূতির হাজার হাজার গান গেয়েছেন এন্ড্রু কিশোর। তার সবচেয়ে জনপ্রিয় গানের মধ্যে রয়েছে- জীবনের গল্প আছে বাকি অল্প, হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস, ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে, আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি, আমার বুকের মধ্যে খানে, পৃথিবীর যত সুখ আমি তোমার ছুঁয়াতে খুঁজে পেয়েছি, সবাইতো ভালোবাসা চায়, বেদের মেয়ে জোসনা আমায় কথা দিয়েছে, তুমি আমার জীবন আমি তোমার জীবন, ভালো আছি ভালো থেকো, তুমি মোর জীবনের ভাবনা, চোখ যে মনের কথা বলে, পড়েনা চোখের পলক ইত্যাদি।

বাংলাদেশের পাশাপাশি কলকাতার সিনেমাতেও গান করেছেন এন্ড্রু কিশোর। সিনেমার গানের জন্যই যেন জন্মেছিলেন এই গায়ক। ভক্ত-অনুরাগীরা তাকে ভালোবেসে প্লেব্যাক সম্রাট বলে ডাকে। সঙ্গীতে উজাড় করে দিয়েছেন নিজেকে। আর বিনিময়ে পেয়েছেন কোটি কোটি মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। সেইসঙ্গে রাষ্ট্র তাকে আটবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সম্মানিত করেছে।

আজ দয়ালের কাছেই ফিরে গেলেন অ্যান্ড্রু কিশোর। ‘নয়নের আলো’ সিনেমার সেই গান ‘আমার সারাদেহ খেয়েওগো মাটি’ এই গানের কথায় তাঁর দেহটি মাটিকে খেতে দিয়েছেন।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here