প্রবাসে শ্রমিকের দুর্দশায় খেলাপি ঋণ বাড়ছে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের

প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক
প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক
প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রায় ৪০ হাজার জনকে ৪৫৫ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে । বর্তমানে এ ঋণের বড় একটা অংশই খেলাপি হয়ে পড়েছে। মূলত বিদেশ গিয়ে দুর্দশায় পড়া গ্রাহকদের ঋণই সবচেয়ে বেশি খেলাপি হচ্ছে বলে জানিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক।

সম্প্রতি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ওই বৈঠকে ব্যাংকের পক্ষ থেকে দেয়া এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।

ব্যাংকের দেয়া প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছরের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ৩৯ হাজার ২৯০ জন বিদেশগামী ও বিদেশফেরত কর্মীকে ৪৫৫ কোটি ৩ লাখ টাকা ঋণ দিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক। এর মধ্যে ৩৩১ কোটি ১৪ হাজার টাকা আদায় করা হয়েছে। বাকিটা খেলাপি হয়ে গেছে। ঋণখেলাপি হয়ে পড়া গ্রাহকদের অধিকাংশই দালালদের খপ্পরে পড়ে বা অন্য কোনো কারণে বিদেশে গিয়ে দুর্দশায় পড়ছেন। এ কারণে ঋণের কিস্তি শোধ করতে পারেননি তারা।

প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠা হলেও ২০১৮ সালের ৩০ জুলাই তফসিলি ব্যাংক হিসেবে তালিকাভুক্ত হয় । তফসিলি ব্যাংক হওয়ার পর থেকেই ব্যাংকটির ঋণ আদায় পরিস্থিতির অবনতি হতে শুরু করে। তফসিলভুক্ত হওয়ার আগে ব্যাংকটির শ্রেণিকৃত ঋণের হার ছিল ১০ শতাংশ। বর্তমানে এ হার ১৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় ঋণ আদায়ে ব্যাংকের তত্পরতা বাড়াতে বলেছে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।

ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাহ্তাব জাবিন ঋণের আদায় পরিস্থিতি নিয়ে সংসদীয় কমিটির বৈঠকে জানান, এ ব্যাংকের ঋণ প্রদান কার্যক্রম অন্য ব্যাংকের মতো নয়। এ ব্যাংক থেকে জামানতবিহীন ঋণ প্রদান করা হয়। ফলে প্রচুর পুনঃতফসিল করতে হচ্ছে। কারণ যারা বিদেশ থেকে ফেরত আসে, তারা ঠিকমতো কিস্তি দিতে পারছে না। ব্যাংকটির কার্যক্রম মাইক্রোক্রেডিটের আওতায় আনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি দেয়া হয়েছে।

সংসদীয় কমিটির সভাপতি জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) সঙ্গে সমন্বয় করে ঋণ দেয়া হয় কিনা জানতে চাইলে ব্যাংকের এমডি বলেন, চাকরির চুক্তি দেখে নয়, বিএমইটির রেজিস্ট্রেশন ও ভিসা দেখে বিদেশগামী কর্মীদের ঋণ প্রদান করা হয়। আত্মীয়দের মাধ্যমে ব্যক্তিগত উদ্যোগে যাওয়ার ফলে অধিকাংশ বিদেশগামী কর্মীরই চাকরির কোনো চুক্তি থাকে না।

ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ২০১৬ সালে অনুমোদিত বিদ্যমান সাংগঠনিক কাঠামোয় ১০০টি শাখার জন্য ৭২৫ জনবলের অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। অনুমোদিত এ জনবলের মধ্যে সরাসরি নিয়োগযোগ্য পদ ৪৩২টি ও পদোন্নতিযোগ্য পদ ২৯৩টি এবং তত্কালীন মোট কর্মরত জনবল ছিল ১৬৬ জন। বর্তমানে ব্যাংকটির শাখা ৬৩টি। সে হিসেবে শাখাপ্রতি জনবল তিনজন। আর প্রতি শাখার আওতাধীন এরিয়া প্রায় ৭০-৭৫ কিলোমিটার। ঋণ আদায় পরিস্থিতির পাশাপাশি ব্যাংকটির জনবল সংকটের বিষয়টিও উঠে এসেছে সংসদীয় কমিটির বৈঠকে।ফলে শাখার পক্ষে ঋণ কার্যক্রম তদারকি করা দুরূহ।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন পদে ১৮ জনকে নির্বাচিত করে ব্যাংকে তালিকা পাঠালে ব্যাংক তাদের তাত্ক্ষণিক নিয়োগ দেয় কিন্তু পরবর্তী সময়ে তারা চাকরি ছেড়ে চলে যায়। অন্যান্য ব্যাংকের তুলনায় সুযোগ-সুবিধা কম থাকায় এ ব্যাংকের চাকরিতে অনেকেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের শাখাগুলোর মধ্যে বর্তমানে ৫৬টি জেলা পর্যায়ে ও সাতটি উপজেলা পর্যায়ে অবস্থিত। ঝালকাঠি, মেহেরপুর, নীলফামারী, জয়পুরহাট, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় শাখা এবং লালমনিরহাট, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলায় ব্যাংকের কোনো শাখা নেই। ওই নয়টি জেলাসহ ২০টি নতুন শাখা খোলার প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠানো হয়েছে বলে সংসদীয় কমিটিকে জানিয়েছে ব্যাংকটি।

মূলত তিনটি উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক আইন, ২০১০ দ্বারা ২০১১ সালের ২০ এপ্রিল ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। উদ্দেশ্য তিনটি হচ্ছে—বিদেশ গমনেচ্ছু বেকার বাংলাদেশী যুবকদের সহায়তা প্রদান, প্রবাসী বাংলাদেশীদের দেশে বিনিয়োগে উৎসাহিতকরণ এবং দেশে প্রত্যাবর্তনের পর কর্মসংস্থানে সহায়তা, দ্রুত ও ব্যয়-সাশ্রয়ী পন্থায় সহজে রেমিট্যান্স প্রেরণে বাংলাদেশীদের সহায়তা প্রদান।

সংসদীয় কমিটির সদস্য অধ্যাপক মো. আলী আশরাফ বলেন, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে বিদেশগামী কর্মীদের ঋণ প্রদান করা হয় সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে। সে লক্ষ্য কতটুকু অর্জিত হয়েছে, সে তথ্যও থাকা উচিত।

কমিটির সভাপতি আনিসুল ইসলাম মাহমুদ জানান, বৈঠকে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক নিয়ে আলোচনা শেষে ওই ব্যাংককে আধুনিক ও যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে ব্যাংকের জনবল বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া ব্যাংকঋণ আদায়ে তত্পরতা বাড়াতে বলা হয়েছে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here