প্রমা আবৃত্তি সংগঠনের তিন দিনের উৎসব

প্রমা আবৃত্তি সংগঠনের তিন দিনের উৎসব
প্রমা আবৃত্তি সংগঠনের তিন দিনের উৎসব

প্রমা আবৃত্তি উৎসব- ২০১৯ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেশের বরেণ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা বলেছেন, ঐক্যবদ্ধভাবে রাজনীতি সচেতন সংস্কৃতি চর্চার মধ্য দিয়েই সোনার বাংলা গড়া সম্ভব হবে।

৩০ বছর পূর্তিতে তিন দিনব্যাপী এই উৎসব আয়োজনে সার্বিক সহযোগিতা করছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এবং চট্টগ্রামের ভারতীয় সহকারী হাই কমিশন।

উৎসবের উদ্বোধন করে উদ্বোধক বরেণ্য শিল্পী হাসান ইমাম বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধসহ নানা অন্দোলনে সাংস্কৃতিক কর্মীরা যুক্ত হয়েছেন এবং সফল হয়েছেন। আমরা দেশের মানুষের কাছে থেকেছি। আশাকরি আগামী প্রজন্মও দেশের মানুষের পাশে থাকবেন। কোনো প্রলোভনে বা ভয়ে প্রভাবিত হবেন না। দেশ, মুক্তিযোদ্ধা, শহীদদের কথা ভেবে নবীনরা নি:শ্বার্থভাবে কাজ করবেন। আগের রাজনীতিবিদদের সাথে ব্যক্তিগত যোগাযোগ ছিল। বঙ্গবন্ধুর সাথে কবি জসিম উদ্দিনসহ সকলের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল। ১৯৫৭ সালে তিনি সাংস্কৃতিক সংগঠন করেন। তিনি বলেছিলেন, আামাদের সাংস্কৃতিক বিপ্লব দরকার। শিক্ষা ও সংস্কৃতি পারে সোনার মানুষ গড়তে। রাজনীতিবিদদের বলবো- আমরা সোনার মানুষ গড়ায় থাকবো, আপনারা সোনার দেশ গড়ুন।

অনুষ্ঠানে একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেন বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে দেশের কোনো শিল্প মাধ্যমই শুধু শিল্পের দায় মিটিয়ে থাকতে পারেনি। রাজনৈতিক-সামাজিক দায়ও মেটাতে হয়েছে। দেশে স্বৈরাচার ও সাম্প্রদায়িকতার উত্থান আমাদের সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগকে সংকুচিত করেছে। এক শ্রেণির মানুষ গণতন্ত্র, সংস্কৃতি, নারী, শিশু ও প্রকৃতির বিরুদ্ধে তাদের আস্ফালন দেখিয়েছে। সমাজ তার পশ্চাৎপদতা, অহমিকা দেখিয়েছে। কিছুতেই আমরা শুধু শিল্পকলার সাধনায় নিয়োজিত থাকতে পারিনি। নানা কাজে ভূমিকা রাখতে হয়েছে। এখন আমাদের একটি সাংস্কৃতিক বাতাবরণ দরকার। অধিক সংখ্যক মানুষ ও সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর উপায় নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে।

শহীদ জায়া ও শহীদ ভগ্নি বেগম মুশতারী শফী বলেন, অনেক রক্ত ঢেলে দেশ স্বাধীন হয়েছে। ক্ষমতায় থেকে বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশকে বিশ্বের দরবারে অনেকটা এগিয়ে নিয়ে গেছেন। কিন্তু দেশের ভেতর মানুষ নানাভাবে পিড়ীত হচ্ছে। পত্র পত্রিকা খুললেই নানা রকম অত্যাচার নারী নির্যাতন খবর দেখি। এসব থেকে মুক্ত কবে হব? সংস্কৃতি চর্চার মধ্য দিয়ে এসব থেকে মুক্তির জন্য এগিয়ে নিতে হবে। সম্মিলিতভাবে মুক্তির উপায় খুঁজতে হবে। তরুণদের দিকে তাকিয়ে আছি। তরুণদের উজ্জীবিত করে অনাচার দূর করলে দেশ সোনার বাংলা হবে।

দৈনিক আজাদী সম্পাদক এম এ মালেক বলেন, বাংলাদেশ যেন বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে ওঠে। কিভাবে হবে? সব ঢাকাকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। চট্টগ্রাম মানে গ্রাম, সে গ্রামেই আছি। যদি বেরিয়ে আসতে পারি তাহলে বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে পারব। নেতানেত্রীরা ট্রেনে উঠলেই আর চট্টগ্রামের কথা মনে থাকে না। যখন পুরো দেশকে দেশ হিসেবে দেখবেন তখন দেশ গড়ে উঠবে। পরমতসহিষ্ণু হতে হবে। আবরারের মত আর কোনো ঘটনা দেখতে চাই না।

বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আহকাম উল্লাহ বলেন, আমাদের ঐক্যের বাংলাদেশ গড়তে হবে। সব মানুষের ঐক্যই পারে আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশে পৌঁছে দিতে।

বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের সভাপতিম-লীর সদস্য শিমুল মোস্তফা শিমুল মুস্তফা বলেন, এদেশে স্বদেশ বিদ্বেষী মানুষ আছে। যারা স্বাধীনতাকে, জাতীয় সঙ্গীতকে, জাতীয় পতাকাকে স্বীকার করে না। তাদের ধিক্কার জানানো উচিত, একঘরে করা উচিত। এদেশে যারা পাকপন্থী তাদের বিতাড়িত করতে হবে। নতুন প্রজন্মের কাছে অনুরোধ ঐক্যবদ্ধ থাকুন। এদেশের ভাষায়, পতাকায়, অস্তিত্বে রক্ত।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফ বলেন, এখন এমন অবস্থা যেন সবকিছু রাজনীতির মানুষের কাছ থেকে শিখতে হবে। তারা কারো কাছ থেকে শিখবে না। সেটা বাংলাদেশ না। কবিতার কথা রাজনীতিবিদরা শুনেছেন সেটাই ছিল বাংলাদেশ। স্বাধীনতা যদি কৃষকের হাসি হয়, কৃষক যদি হাসি হারায় তাহলে বিশ্বাস করতে হবে স্বাধীনতা ম্লান হচ্ছে। সংখ্যাগরিষ্ট মানুষের ধর্ম পালন যদি উদারতার জায়গা থেকে না হয় তাহলে স্বাধীনতা ম্লান হয়। রাজনীতিবিদদের দায়িত্ব কবিতার মত বাংলাদেশ করে দেয়া। সবকিছু গান কবিতা দিয়েই তাদের বুঝতে হবে।

অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে প্রমার সভাপতি রাশেদ হাসান বলেন, নব্বইয়ের উত্তাল সময়ে যাত্রা শুরু। এ পথচলায় অনেক মানুষ যুক্ত হয়েছেন। সকলের প্রয়াসে প্রমা আজ এখানে। তাদের সকলের প্রতি আমাদের ভালোবাসা। শিল্পের সব শাখার সাথে যারা যুক্ত বিশ্বাস করি মানুষের জন্য শিল্প। যে খারাপ বিষয় ও সময়ের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছি। শিল্পের চর্চার মধ্য দিয়ে শুভবোধ জাগ্রত করতে চাই মানুষ, সমাজ ও রাষ্ট্রের ভেতর। সংস্কৃতি কর্মীরা যদি সামষ্টিক শুভবোধ জাগ্রত করতে পারি, সমাজকে নাড়া দিতে পারি তাহলে মানবিক সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণ সম্ভব। লক্ষ্যে অটুট থাকলে শিল্পের, মানুষের, শুভবোধের জয় হবে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রমার সাধারণ সম্পাদক বিশ্বজিৎ পালের সঞ্চালনায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন প্রমার সহ-সভাপতি কঙ্কন দাশ। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক মুনতাসিম বিল্লাহ। উপস্থিত ছিলেন প্রমার সহ-সভাপতি স্বপন দাশ ও জেরিন মিলি।

বেলুন উড়িয়ে আমন্ত্রিত অতিথিরা উৎসবের উদ্বোধন করেন। এরপর শতকণ্ঠে আবৃত্তি দিয়ে আবৃত্তি পর্বের উদ্বোধন হয়। এরপর প্রমা অবন্তীর পরিচালনায় উদ্বোধনী নৃত্য পরিবেশন করবে ওডিসি এন্ড টেগোর ডান্স মুভমেন্ট সেন্টারের শিল্পীরা।

এবারের উৎসবের প্রথম দিনের অনুষ্ঠান উৎসর্গ করা হয়েছে আবৃত্তি শিল্পী ও সংগঠক নিখিল সেন এবং কামরুল হাসান মনজুর স্মৃতিতে।

আমন্ত্রিত আবৃত্তিশিল্পীদের মধ্যে আবৃত্তি পরিবেশন করেন বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের সভাপতিম-লীর সদস্য মোকাদ্দেস বাবুল, বরেণ্য বাচিকশিল্পী দুলাল দাশগুপ্ত, বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের যুগ্ম সম্পাদক কাজী মাহতাব সুমন, নির্বাহী সদস্য শামস উল আলম মিঠু, সাংগঠনিক সম্পাদক (ফরিদপুর অঞ্চল) শাহদাত হোসেন লিটন, উঠোন সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সভাপতি আয়শা হক শিমু, বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের প্রচার সম্পাক ফয়জুল্লাহ সাঈদ, প্রকাশনা সম্পাদক জি এম মোরশেদ, নির্বাহী সদস্য জালাল উদ্দিন হীরা, নির্বাহী সদস্য সাইমুম আনজুম ইভান।

কবি কণ্ঠে কবিতাপাঠ পর্বে অংশ নেন স্বপন দত্ত, ফাউজুল কবির, ওমর কায়সার, এজাজা ইউসুফী, বিজন মজুমদার, হোসাইন কবির, কামরুল হাসান বাদল ও নাজিম উদ্দিন শ্যামল।

দলীয় আবৃত্তি পরিবেশন করেন চট্টগ্রাম আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্র এবং প্রমা আবৃত্তি সংগঠন। চট্টগ্রামের শিল্পকলা একাডেমির মুক্ত মঞ্চে উৎসবের দ্বিতীয় দিন শুক্রবার আবৃত্তি, র‌্যালি ও আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here