রবীন্দ্রনাথের দোহাই দিয়ে বিজেপির দাবি: করিমগঞ্জের নাম বদলে ‘শ্রীভূমি’

স্মৃতি ইরানি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একশো বছর আগে সিলেট সফরের সময়ে করিমগঞ্জেও গিয়েছিলেন। সেই ঘটনার শতবার্ষিকী উৎযাপনের সময়ে দাবি উঠেছে, তিনি সিলেটকে ‘শ্রীভূমি’ বলে বর্ণনা করেছিলেন, তাই করিমগঞ্জের নতুন নাম হোক শ্রীভূমি। সেই আসামের বরাক উপত্যকার অন্তর্গত করিমগঞ্জের নাম বদল করে শ্রীভূমি রাখার দাবি নিয়ে সেখানে দানা বাঁধছে নতুন বিতর্ক।

দাবিটা যেহেতু জোরালোভাবে জানিয়েছেন ভারতীয় জনতা পার্টির একজন বিধায়ক তাই বিশ্লেষকদের অনেকেই এতে রাজনীতি দেখছেন। তারা বলছেন যেভাবে নানা শহরের ইসলামিক নাম যেভাবে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরে বদলানো হয়েছে, সেই একই ভাবনা এখানেও কাজ করছে। ১৯১৯ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পা রেখেছিলেন করিমগঞ্জ শহরে। সেখানে একটি সভা করে তারপরে গিয়েছিলেন সিলেটে।

গবেষকরা মনে করেন শ্রীহট্ট বা সিলেট সফরকালেই কাউকে সম্ভবত অটোগ্রাফ দিতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ওই অঞ্চলকে বর্ণনা করে লিখেছিলেন : “মমতাবিহীন কালস্রোতে, বাঙলার রাষ্ট্রসীমা হোতে, নির্বাসিতা তুমি, সুন্দরী শ্রীভূমি।”

অবিভক্ত সিলেট জেলার মধ্যে শুধু করিমগঞ্জই দেশভাগের পরে ভারতে যুক্ত হয়েছে তাই করিমগঞ্জের নাম পাল্টিয়ে রবীন্দ্রনাথের বর্ণনা অনুযায়ী শ্রীভূমি করার দাবি উঠেছে।
এই দাবি নিয়ে খুব তাড়াতাড়ি মুখ্যমন্ত্রীর কাছে দরবার করবেন বলেও মি. দেব জানিয়েছেন।

করিমগঞ্জে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পদার্পণের শতবার্ষিকী উদযাপন কমিটির যে সভা থেকে তিনি এই দাবি তুলেছিলেন, সেখানে হাজির ছিলেন আরেক বিজেপি নেতা মিশনরঞ্জন দাস। তিনিও বিবিসিকে বলেছেন যে দাবিটির সঙ্গে তিনি সহমত এবং তারাও এই দাবী জানাবেন সরকারের কাছে।

তবে বিশ্লেষকদের একাংশ আর বরাক উপত্যকার সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলি বলছে করিমগঞ্জের নাম বদলের প্রসঙ্গটি রাজনৈতিক দাবি। সাম্প্রদায়িক বিভেদ সৃষ্টির জন্য বিজেপি এই দাবি তুলেছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে।
বরাক উপত্যকা বঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলনের সাধারণ সম্পাদক গৌতম দত্ত বিবিসিকে বলেন, “আসামের বাঙালীরা এখন একটা মহাসঙ্কটের মুখোমুখি। এনআরসির মাধ্যমে ১৯ লক্ষ মানুষ, যাদের মধ্যে সিংহভাগ বাঙালী, তারা রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কায় রয়েছেন। এই সময়ে একটা প্রান্তিক শহরের নাম বদলের প্রস্তাব দেয়াটা একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক। আসল সমস্যা থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে দিতেই করিমগঞ্জের নাম বদলের প্রস্তাব তোলা হয়েছে। আমরা সংগঠনগতভাবে এর বিরোধিতা করছি।” তিনি বলেন, “ডিটেনশান ক্যাম্পগুলোতে কয়েকশো হিন্দু বাঙালী বন্দী রয়েছেন, যারা মারা যাচ্ছেন বন্দীশিবিরে, তাদেরও অনেকে হিন্দু বাঙালী। শিলাদিত্য দেবদের দল বা তিনি নিজে কী করছেন সেই বিষয়ে তারা তো হিন্দুদের কথা বলেন সবসময়ে?”

মঙ্গলবার একটি সভায় ওই দাবিকে জোরালোভাবে তুলে ধরেন হোজাইয়ের বিজেপি বিধায়ক শিলাদিত্য দেব। আসামে বিজেপির এক সভায় বক্তৃতা দিচ্ছেন দলের নেত্রী এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী স্মৃতি ইরানি। তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম কেন নাম বদলের দাবি তিনি তুললেন।

“বরাক উপত্যকার বেশিরভাগ মানুষই সিলেটি। তাই সিলেটের সঙ্গে তাদের একটা আবেগ জড়িয়ে আছে। কিন্তু যখন পুরো সিলেট আর ভারতের থাকল না, শুধু করিমগঞ্জ অঞ্চলটা এদেশে এল, তখন থেকেই বরাকের মানুষের একটা সেন্টিমেন্ট জড়িয়ে রয়েছে সিলেটকে নিয়ে। আমি ওই অনুষ্ঠানে যখন করিমগঞ্জে গিয়েছিলাম, অনেকেই আমাকে জানিয়েছিলেন যে রবীন্দ্রনাথের করিমগঞ্জ পদার্পনের শতবার্ষিকীতে তাঁকে শ্রদ্ধা জানানোর সবথেকে ভাল উপায় হবে যদি তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী করিমগঞ্জের নাম যদি শ্রীভূমি রাখা যায়। সেজন্যই তাদের দাবিটিকে আমি পূর্ণ সমর্থন জানানোর কথা বলেছি,” বলছিলেন বিজেপি বিধায়ক শিলাদিত্য দেব।[

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here