বিলাইছড়ি ধূপপানি ঝরনা# প্রথম দেখা যদি শেষ দেখা হয়!!

রাঙ্গামাটির বিলাইছড়িতে ধূপপানি ঝরনা
রাঙ্গামাটির বিলাইছড়িতে ধূপপানি ঝরনা

লালপাহাড়ের দেশে, ঐ ধুপপাড়ার নীচে, রাঙ্গামাটির বিলাইছড়িতে একটি অপরূপ ঝরনা আছে। নাম ধূপপানি ঝরনা। প্রকৃতির অপরুপ সৃষ্টি ধূপপানি ঝরনাটি। বিনোদন পিয়াষু ভ্রমণ পিয়াষুদের এই ঝরনা মোহিত করে। বিলাইছড়ির ধূপপানি ঝরনায় যেতে কাদামাখা পিচ্ছিল, সরু মেঠো, অসম উঁচু নিচু, আঁকাবাঁকা, পাহাড়ি পথে ছুটতে হবে মাধুকরীর বেশে একনজর সেই রুপসীকে দেখতে।

এই রুপসী ঝরনার রুপে মোহীত লাখো পর্যটকের পদভারে মুখরিত বিলাইছড়ির ধূপপানি। বিশাল পাহাড়ের শরির বেয়ে নেমে আসা এই ঝরনাটি প্রকৃতি নিজেই ইচ্ছেমতো রুপ সৌন্দর্য দিয়ে মায়াবী বা ঐন্দ্রজালিক জাদুকর করে সৃষ্টি করেছেন। পাহাড়ের শরীর বেয়ে ছোট বড় পাথর টপকিয়ে চলচলানি কলতানে বয়ে চলেছে এই ঝরনাধারা। সবুজ কিরীটিনী বিলাইছড়ির ধূপপানি ঝরনা, পাহাড়গুলোর চূড়ায় শোভা পাচ্ছে নানান রকমের বৃক্ষরাজি। সুমধুর শন শন শব্দে স্বচ্ছ জলধারা আছড়ে পড়ছে ছোট বড় শক্ত পাথরগুলির গায়ে।
বিলাইছড়ি উপজেলা সদর থেকে দুই ঘন্টার নদী পথে উলুছড়ি যেতে হয়। উলুছড়ি হতে কোষা নৌকায় চড়ে পাহাড়ি ঢর পার হয়ে পায়ে হেটে এগুলেই ধূপ পানি ঝরনা। উলুছড়ি থেকে স্থানীয় গাইড কিরন তঞ্চঙ্গার সহযোগিতায় পাহাড়ি আঁকা-বাঁকা পথ আর ছড়া দিয়ে ধূপপানি ঝরনায় গিয়েছিলাম। এই ঝরনার পানি আছড়ে পড়ার শব্দ ২ কিলোমিটার দূরে থাকতে শোনা যায়।
ধুপপানি ঝরনা বাংলাদেশের সুন্দর ঝরনাগুলোর মধ্যে এটি একটি। এই ঝরনার নিচে একটা গুহার মত আছে। আর ঝরনার নিচের এই গুহাটাতে বসলে মনে হয় যেন অন্য কোন জগতে চলে গেছি।

প্রায় ২০০ ফুট উচু হতে ৬ ফুট উচ্চতার প্রায় ১৫ ফুট ব্যাস নিয়ে শুভ্র আকার ধারণ করে আঁছড়ে পড়ছে নীচে। ধুপপানি পাড়া থেেক নামতে হবে খাড়া ৭০০/৮০০ ফুট যা কমপক্ষে ৩০ মনিটিরে ধাক্কা। মনিুষের দপদভারে মুখরিত থাকে এই ঝরনাটি। মন ছুটে একবার দেখতে।

চল এখন যাই, লালপাহাড়ের দেশে যাই, ধুপপানি ঝরনায় যাই। কাপ্তাই থেকে নৌকায় উঠেছি, মাঝি নৌকা ছাড়েনি, হালও ধরেনি। মন বড় অস্থির কবেযে নৌকা ছাড়বে।

হুমম, মাঝি এদিকে এসো, একটু কথা শোন,আমাকে ধূপপানি ঝরনায় নিয়েযাও, তোমাকে দিবো টাকা সাত কুড়ি, আমার হাতে হিরের আংটি আছে, তোমাকে দিবো তাও, আমাকে যদি ধূপপানি ঝরনায় নাও। দেখো মাঝি এই চকচকে হিরের আংটি তোমাকে দিবো, আমাকে তুমি ধূপপানি ঝরনায় নাও। তোমার নৌকাতো মাঝি ঘাটে বাঁধা আছে, যাবে কি বিলাইছড়ি? মিনতি করি মাঝি, নিয়ে চলো আমায় আর জেভারে ধূপপানি ঝরনার কিনারে। জেভাকে চেনোনা? জেভা আমার মেয়ে, তোমার নৌকায় বেড়াবো আমরা মুপ্পোছড়া হতে ধূপপানি ঝরনা আর বাঙ্গালকাটা বেয়ে, নৌকা তোমার ডুববেনা চালাও ধীরে লয়ে।

আকাশে ঘনকাল মেঘ, শরতে খেলা করে মেঘ বৃষ্টি রোদে, প্রকৃতির প্রভাত জাগে রক্ত রবির বোধে। আমরা ভিজবোনা জেভার কাছে লাল ছাতি আছে আর নীল রঙ আমারটা, বৃষ্টি নামলে তোমাকে দিবো নীল ছাতিটা। চারি পাশে সবুজের পতাকা নাচে, জেভার ছোঁয়া রেখে যাবো পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে। মেয়ে আমার জীবনের সঞ্চিত ধন, তাকে ঘিরে রাখবে এই ঘনসবুজ বন। পানির কন্ঠে পারতাম যদি কন্ঠ মেলাতে আমি, কিন্তু সেই মিলনের সুর আমার কন্ঠে দেয়নি অন্তর্যামী। আমরা চাই আজ হারাতে মেঘের কোলে,ভাসব উপরে যাব মেঘের দেশে চলে।
মাঝি একটু দাঁড়াও, নদীর তলানিতে সাদা সাদা মুক্তো দেখা যায়, ঐগুলো তুলে দাও আমায়,ঐ মুক্তো দিয়ে মালা গাঁথবো, ওই মুক্তোমালা পরাবো জেভার গলায়।
ছড়ার কিনারে হরেক রকম নুড়ি, সাদা বাদামী আর সোনলী, মাঝি,ওখানে চালাও একটু ধীরে, দেখ পানি নুড়িকে ধরে ঘিরে, চুমু দিয়ে ডিকবাজি খেয়ে ফিরে। সংসার পেতেছে বুঝি পানি আর নুড়ি মিলে? মাছগুলো কিলবিল করে, লাফদিয়ে উপরে উঠে, নিমিষে ডুবে জলে। তারা উঠে আর ডুবে, টুপ টুপ করে, রুপা পড়ার তালে। আমিও দিবো ডুব জলে, তাদের তালে তাল ধরে।

হরিণ হরিণী জলের কিনারে এসে চোখ তুলে তাকায় দূরে, পানি খায় হাটু গেড়ে মুখ তুলে তাকায় আমাদের দিকে, ওরা কি ভালবাসে আমাকে আর জেভাকে ? নদী তাদের বন্ধু পাহাড়গুলো ঘর, কি বল মাঝি ভাই ? আমরা কি তাদের পর ?
মাঝি এখানে কি দোকানিরা ছন বেচে, ছড়ার নীল জলে বানাবো বাড়ি শেষে। আমি আর জেভা কাটাবো জীবন এই ঝরনার কাছে। এই ঘন সবুজ বনবিহারীর দেশে।

মাঝি তুমি কি দোতারা বাজাতে জানো? তুমি কি জানো ভাই ঝরনার তারে কেন বাজায় সুর, রুপালি তারের শব্দ কেন এতো মধুর? এই দেখ মাথার উপর সবুজ ঘেরা নুইয়ে মিতালি পাতছে। জেভাকে কি যেন বলছে। পাহাড়গুলো সাদা মেঘ মাথায় নিয়ে দুলছে। পালবেঁধে বলাকারা নীড়ে ফিরছে, জেভা আঙ্গুল তুলে দেখাচ্ছে, সূর্যটা আস্তে আস্তে বিদায় নিচ্ছে।

ওটা ঝরনা বুঝি? এ তো ভারি সুন্দর। এ যেন রুপোর কার্পেট বোনা, ধুপপানি ঝরনা? শোন মা জেভা, হাতে গামছা নিয়ে আস, গা ভাসিয়ে আসি ঝরনার জলে, কানামাছি খেলে নিজেকে লুকিয়ে রাখি রুপালী পর্দার তলে। তুমি খুঁজে পাবেনা আমায়, কাধে তুলে চড়াবো আমাকে খঁজে পেলে।

জেভা বললো ধুপপানি ঝরনার সাখে মাখামাখি হলো শেষ, সাঙ্গ হলো অনেক দিনের জমানো রেশ। ফিরে চল,একটা গান ধরো মাঝি আমার সুরে সুর ধরো-

**নোঙ্গর খুলে দাও, মাঝি ভাই, পাল তুলে দাও
আমার হৃদয় মাঝে ঝরনা, যাবো মোহনায়
আমার হৃদয় মাঝে ঝরনা যাবো মোহনায়..।

পাহাড়ের বুক চিরে রুপোর চাদর আয়, গিরিপথের অরণ্য মেঘে ঢেকে যায়
বনবিহারীর পথ ধরে নৌকা বেয়ে নাও,
মাঝি ভাই, পাল তুলে দাও….
আমার হৃদয় মাঝে ঝরনা, যাবো মোহনায়।।**

পাহাড় আর গাছপালা দেখতে দেখতে ফিরে আসতে শোনা যায় পাহাড়ের কত শত পাখির সুমধুর ডাক। কখনো আবার কানে ভেসে আসে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। একদিকে মানুষের কোন কোলাহল নেই, অন্যদিকে পাহাড়ি শত শত পাখির ডাক আর ছড়া দিয়ে বয়ে যাওয়া জলের শব্দ মনমুগ্ধকর এক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। মুহূর্তেই নিজেকে হারাই কোন এক অজানা দেশে।
মন চাচ্ছেনা ফিরতে বারবার পিছন ফিরেছি, জীবনের সমস্ত আনন্দ সমস্ত সুন্দর যেন রয়েগেছে, ধূপছড়ার নেমে আসা ভাংতি রুপালি মুদ্রায়। মনে শুধু আপসোস জাগে বারবার, কবে দেখবো আবার।

ধূপপানি ঝরনার সামনে দাড়িয়ে টেমস নদী হতে নায়েগ্রা পর্যন্ত অনুভব করেছি। উঁচু হতে রুপালী কাচের ধারা আঁচড়ে পড়ছে নীচে, ঝরনার এই খেলা দেখে আমার চঞ্চলতা বারবার আঁটকে যাচ্ছে, মাথায় রাজদন্ড ধরার মত।
আমার মনে ভিড় করে যত ভয়, ধুপপানি ঝরনা প্রথম দেখা যদি শেষ দেখা হয়!
[ লেখক : আবদুর রউফ পাটোয়ারী ]

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here