বিপ্লবের অগ্রযাত্রায় দেশের ওষুধ শিল্প

বিপ্লবের অগ্রযাত্রায় দেশের ওষুধ শিল্প
বিপ্লবের অগ্রযাত্রায় দেশের ওষুধ শিল্প

বাঁধার পাহাড় পেরিয়ে বিশ্বের ওষুধ বাজারে বিস্ময়কর প্রসার ঘটেছে বাংলাদেশের। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে একসময় ওষুধ দেয়নি উন্নত বিশ্ব। বিপ্লবের অগ্রযাত্রায় এখন দেশের ৯৮ শতাংশ চাহিদা মিটিয়ে বিশ্বের ১৬০টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে বাংলাদেশের ওষুধ। এখন পোশাক শিল্পের মতোই ইউরোপ-আমেরিকার বাজারেও জেঁকে বসেছে বাংলাদেশের ওষুধ। বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় উৎপাদন খাতগুলোর অন্যতম ওষুধ শিল্প। ২০১৭-১৮ অর্থবছর শেষে দেশে ওষুধ শিল্পের অভ্যন্তরীণ বাজার ছিল ২৪৪ কোটি ডলারের। ২০২৩ সাল নাগাদ এ বাজারের ব্যাপ্তি বেড়ে দাঁড়াবে ৭৬০ কোটি ডলারে, যা বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকার সমান।

বাংলাদেশের ব্যক্তি খাতের মূল্যায়ন নিয়ে একটি প্রতিবেদন গতকাল প্রকাশ করেছে মার্কিন উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডি। ‘কম্প্রিহেনসিভ প্রাইভেট সেক্টর অ্যাসেসমেন্ট’ (সিপিএসএ) শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

সম্ভাবনাময় এ খাতের প্রতিবন্ধকতাগুলোও তুলে ধরেছে ইউএসএআইডি। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ বলছে, দক্ষ মানবসম্পদের অভাব, রফতানি বাজার সম্প্রসারণে প্রতিবন্ধকতা, কাঁচামালে আমদানি নির্ভরশীলতা ও ওষুধের মান পরীক্ষাকারী ল্যাবের অনুপস্থিতির মতো প্রতিবন্ধকতাগুলো এখনো রয়ে গেছে সম্ভাবনাময় এ খাতে।

রাজধানীর আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (অ্যামচেম) কার্যালয়ে ৫নভেম্বর এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে ইউএসএআইডি। প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. সিরাজুল ইসলাম, বাংলাদেশ সফররত ইউএসএআইডির উপ-প্রশাসক বনি গ্লিক, ঢাকা মিশন উপ-প্রধান জোয়ান ওয়াগনারসহ ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ও কূটনীতিকরা উপস্থিত ছিলেন।

প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়, বাংলাদেশে ওষুধের অভ্যন্তরীণ বাজারের ব্যাপ্তি ২৪৪ কোটি ডলারের। বার্ষিক রফতানির পরিমাণ ১০ কোটি ৩৫ লাখ ডলার। খাতটিতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছে প্রায় ১ লাখ ৭২ হাজার জন, যার ৮০ শতাংশই বিপণন ও সরবরাহকেন্দ্রিক। খাতটিতে নারীদের অংশগ্রহণ খুবই কম। বিশেষ করে বিপণন ও সরবরাহে নারীদের অংশগ্রহণের সুযোগই নেই। কারণ এখানে গোটা কাজটিই করতে হয় মাঠপর্যায়ে। তবে গ্রামীণ এলাকাগুলোয় কিছুসংখ্যক নারী কর্মী স্থানীয় নারীদের স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছেন। এছাড়া খাতটিতে দক্ষ মানবসম্পদের তীব্র অভাব রয়েছে, যা খাতটির প্রধান প্রতিবন্ধকতাগুলোর অন্যতম। এছাড়া শিল্পে অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও কমপ্লায়েন্স ইস্যুতেও কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, তবে তা সামান্য।

প্রতিবেদনে খাতটি বিকাশের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে অবকাঠামোর বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে বন্দর ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে দেখানো হয়েছে মধ্যম পর্যায়ের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে। এছাড়া রফতানি বাজার প্রসারে প্রতিবন্ধকতা, কাঁচামালে আমদানি নির্ভরশীলতা, ওষুধের মান পরীক্ষাকারী ল্যাবের অভাবের মতো বিষয়গুলোকে এ শিল্পের তীব্র প্রতিকূলতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এসব প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তৈরি পোশাক শিল্পের পর সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাতগুলোর অন্যতম হিসেবে ওষুধ শিল্পকে চিহ্নিত করেছে ইউএসএআইডি।

সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, ওষুধ শিল্প দেশের অন্যতম দ্রুতবর্ধনশীল উৎপাদন খাত। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশের মোট প্রবৃদ্ধিতে ওষুধ শিল্পের অবদান ছিল ১ শতাংশ। ১৯৯৬ সালে এর হার ছিল দশমিক ৯৩ শতাংশ। তবে শিল্পটির ৯৯ দশমিক ৫ শতাংশই অভ্যন্তরীণ বাজারের ওপর নির্ভরশীল।

শিল্পটির প্রায় অর্ধেক মার্কেট শেয়ার এখন প্রথম সারির পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের দখলে। এছাড়া মোট বাজারের ৭০ শতাংশ দখল করে নিয়েছে প্রথম ১০টি প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দখলে মার্কেট শেয়ার রয়েছে মাত্র সাড়ে ১০ শতাংশ। মার্কেট শেয়ারের দিক থেকে বর্তমানে শীর্ষস্থানে রয়েছে স্কয়ার গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির একার দখলে রয়েছে মোট বাজার ব্যাপ্তির ১৮ দশমিক ৮ শতাংশ। দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে রয়েছে যথাক্রমে ইনসেপ্টা ও বেক্সিমকো। এর মধ্যে ইনসেপ্টার দখলে রয়েছে ১০ দশমিক ২ শতাংশ। সাড়ে ৮ শতাংশ রয়েছে বেক্সিমকোর দখলে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিল্পটির ওপর সরকারের বিশেষ নজর রয়েছে। সরকার বর্তমানে এ শিল্পের আমদানি নির্ভরশীলতা কমিয়ে রফতানি বাড়াতে কাজ করছে। ২০১৮-২১ সালের রফতানি নীতিতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে এপিআই খাতকে। ২০১৬ সালে শিল্পটির কাঁচামালে আমদানি নির্ভরশীলতা ছিল ৯৭ শতাংশ। ২০৩২ সালের মধ্যে তা ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনার নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে সরকারের। একই সঙ্গে এ সময়ের মধ্যে পাঁচ লাখ লোকের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার।

প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার পথে রয়েছে। এজন্য আমাদের সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। ডুয়িং বিজনেস সূচকে আগের চেয়ে বর্তমানে আমরা অনেক এগিয়েছি। আমরা এটিকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাব।

ইউএসএআইডির উপ-প্রশাসক বনি গ্লিক বলেন, যখন অভ্যন্তরীণ বাজার তৈরির মাধ্যমে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করা যায়, তখন সেখানে আর বৈদেশিক সহায়তার প্রয়োজন পড়ে না। এ বাজার তৈরি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত জরুরি। কারণ দেশটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার পথে রয়েছে।

ইউএসএআইডির ঢাকা মিশন উপ-প্রধান জোয়ান ওয়াগনার বলেন, বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত যতদূর এগিয়েছে, তা অবিশ্বাস্য। তবে একটি পণ্যের ওপর রফতানি নির্ভরশীলতায় দেশ ঝুঁকিতে থেকেই যায়। বাংলাদেশের অন্যান্য পণ্যেরও সম্ভাবনা রয়েছে। যেমন এখানকার সবজি অত্যন্ত ভালো মানের। তবে এ সবজির ৩০ শতাংশই বাজারের মুখ দেখে না। মাঠপর্যায়েই নষ্ট হয়। কারণ হিমাগার নেই। যুক্তরাষ্ট্র এ জায়গাগুলোয় সহযোগিতা করবে।
ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে ২০০৮ সালে সরকার ওষুধশিল্প পার্ক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here