বায়ুদূষণের ফলে গড় আয়ু কমার দিক থেকে বাংলাদেশ শীর্ষ ১০ এর মধ্যে

বায়ুদূষণের ফলে গড় আয়ু কমার দিক থেকে বাংলাদেশ শীর্ষ ১০ এর মধ্যে
বায়ুদূষণের ফলে গড় আয়ু কমার দিক থেকে বাংলাদেশ শীর্ষ ১০ এর মধ্যে-Use of Marks to protect against air pollution
মানবদেহের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর পিএম২.৫। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মান অনুযায়ী, প্রতি ঘনমিটার বাতাসে পিএম২.৫-এর সহনীয় মাত্রা ১০ মাইক্রোগ্রাম। যদিও বাংলাদেশের প্রতি ঘনমিটার বাতাসে পিএম২.৫-এর পরিমাণ ৬১ মাইক্রোগ্রাম।

বায়ু দূষণ বলতে বোঝায় যখন বায়ুতে বিভিন্ন ক্ষতিকারক পদার্থের কণা ও ক্ষুদ্র অণু অধিক অনুপাতে বায়ুতে মিশে যায় । তখন এটি বিভিন্ন রোগ, অ্যালার্জি এমনকি মৃত্যুর কারণ হতে পারে। পরিবেশ অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শুষ্ক মৌসুমে যে নির্মাণকাজগুলো হচ্ছে, তাতে সকাল ও বিকেল দুই বেলা নির্মাণসামগ্রী, বিশেষ করে বালু ও ইট পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু দেশের বেশির ভাগ সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তাদের নির্মাণসামগ্রী যত্রতত্র ফেলে রেখে ধুলা সৃষ্টি করছে।

দেশের বায়ুমান ক্রমেই খারাপ হচ্ছে। বাতাসে বাড়ছে অতিসূক্ষ্ম বস্তুকণার উপস্থিতি। অতিসূক্ষ্ম এসব বস্তুকণা মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, বাংলাদেশে মৃত্যুর তৃতীয় সর্বোচ্চ কারণ বায়ুদূষণ। এ দূষণের কারণে গড় আয়ুও সবচেয়ে বেশি কমছে বাংলাদেশে।

অপরিকল্পিত শিল্প, যানবাহনের কালো ধোঁয়া, ইটভাটা ও নির্মাণকাজে দূষণ প্রতিরোধী ব্যবস্থার অপর্যাপ্ততা বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, ইটভাটার কারণে সূক্ষ্ম ধূলিকণা বাতাসে মিশে যায়। নির্মাণকাজের সময় নিয়ম না মেনে মাটি, বালিসহ অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী দীর্ঘদিন যত্রতত্র ফেলে রাখা, রাস্তার দুই পাশে ময়লা-আবর্জনা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা, সর্বোপরি যানবাহনের কালো ধোঁয়া বাতাসকে দূষিত করে তোলে। বাতাসে বেড়ে যায় মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর পার্টিকুলেট ম্যাটার (পিএম) বা অতিসূক্ষ্ম বস্তুকণার উপস্থিতি।

মানবদেহের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর পিএম২.৫। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মান অনুযায়ী, প্রতি ঘনমিটার বাতাসে পিএম২.৫-এর সহনীয় মাত্রা ১০ মাইক্রোগ্রাম। যদিও বাংলাদেশের প্রতি ঘনমিটার বাতাসে পিএম২.৫-এর পরিমাণ ৬১ মাইক্রোগ্রাম। বাতাসে সহনীয় মাত্রার অতিরিক্ত অতিসূক্ষ্ম এ বস্তুকণা স্বল্পমেয়াদে মাথাব্যথা, শ্বাসতন্ত্রের রোগসহ নানা ব্যাধির জন্য দায়ী। তবে দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাবে ফুসফুস ক্যান্সার, কিডনিসহ শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অনেক অঙ্গও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শেষ পর্যন্ত যা জীবননাশের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

এইচইআই এবং আইএইচএমইর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফুসফুসজনিত রোগে মৃত্যুর ৪৯ শতাংশ হয় বায়ুদূষণের কারণে। এছাড়া ডায়াবেটিসে মৃত্যুর ২২, হূদরোগে মৃত্যুর ২৪, স্ট্রোকে মৃত্যুর ১৫ ও ফুসফুসের ক্যান্সারে মৃত্যুর ৩৭ শতাংশ ঘটে বায়ুদূষণে। বায়ুদূষণের চেয়ে বেশি মৃত্যু হয় কেবল খাদ্যাভ্যাসজনিত রোগ ও উচ্চ রক্তচাপে। এর বাইরে তামাক, রক্তে উচ্চমাত্রায় সুগার, অপুষ্টি, কিডনি অকেজো হয়ে যাওয়া, উচ্চ এলডিএল ও অন্যান্য পরিবেশগত ঝুঁকিও বাংলাদেশে মৃত্যুর অন্যতম কারণ।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের পুরো জনগোষ্ঠীই বায়ুদূষণের মধ্যে আছে। এর মধ্যেও বেশি ঝুঁকিতে আছে ঢাকার বাসিন্দারা। জাতীয় বায়ুমান অনুযায়ী, প্রতি ঘনমিটার বাতাসে দৈনিক সর্বোচ্চ ১৫০ মাইক্রোগ্রাম পিএম১০ ও ৬৫ মাইক্রোগ্রাম পিএম২.৫ থাকতে পারে। অথচ ঢাকার বাতাসে রয়েছে স্বাভাবিকের চেয়ে তিন গুণ বেশি পিএম। পরিবেশ অধিদপ্তরের এক গবেষণার তথ্যমতে, শুষ্ক মৌসুমে ঢাকার প্রতি ঘনমিটার বাতাসে এর মাত্রা থাকে ৪৯৯ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত।

এছাড়া সুইজারল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আইকিউএয়ারের গতকালের র্যাংকিংয়ে সবচেয়ে দূষিত বাতাসের শহরে বাংলাদেশ ছিল দ্বিতীয় স্থানে। পাকিস্তানের লাহোরের পরই ছিল ঢাকার অবস্থান। র্যাংকিংয়ে ঢাকার পর ছিল যথাক্রমে ভারতের দিল্লি, ভিয়েতনামের হ্যানয় ও ভারতের কলকাতা।

বাংলাদেশের দূষণপ্রবণ এলাকাগুলোর মধ্যে ঢাকা অন্যতম বলে জানান পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (বায়ুমান ব্যবস্থাপনা) জিয়াউল হক। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, গত বছর একাধিক গবেষণায় উঠে এসেছিল ঢাকার চেয়ে পৃথিবীর প্রায় ১৮টি শহরের দূষণের মাত্রা বেশি। এমনকি বর্তমানে দিল্লিতে বায়ুদূষণের মাত্রা ঢাকার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। তবে বাংলাদেশের বিশেষ করে ঢাকায় বায়ুদূষণ যে বাড়ছে, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। দূষণের কারণগুলোও আমরা জানি। সেগুলো প্রতিরোধে পরিবেশ অধিদপ্তর জোরালোভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

বায়ুদূষণ যেসব দেশের মানুষের আয়ু কমিয়ে দিচ্ছে, তার মধ্যেও শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। এইচইআই ও আইএইচএমইর উপাত্ত বলছে, ক্ষুদ্র বস্তুকণার উপস্থিতি ও গৃহস্থালি বায়ুদূষণের কারণে গড় আয়ু সবচেয়ে বেশি কমছে বাংলাদেশে। বায়ুদূষণের ফলে গড় আয়ু কমার দিক থেকে শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার পাঁচটি দেশ। বাংলাদেশ ছাড়াও এ তালিকায় আছে আফগানিস্তান, নেপাল, পাকিস্তান ও ভারত।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বায়ুদূষণে ২০১৭ সালে সারা বিশ্বে ৫০ লাখ মানুষ মারা গেছে। প্রতি ১০ জনে একজনের মৃত্যুর জন্য দায়ী বায়ুদূষণ। আর বায়ুদূষণে মৃত্যুর হারের দিক থেকে শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। বায়ুদূষণে মৃত্যুহারে শীর্ষে রয়েছে চীন। ২০১৭ সালে দেশটিতে বছরে বায়ুদূষণে মারা গেছে ১২ লাখ মানুষ। বায়ুদূষণের কারণে বেশির ভাগ মৃত্যুর ঘটনাই ঘটছে তুলনামূলক নিম্ন আয়ের দেশগুলোয়। এ ধরনের মৃত্যুর ৯০ শতাংশের বেশি ঘটছে মূলত এশিয়া ও অফ্রিকা, পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, ইউরোপ ও আমেরিকার নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোয়। অসংক্রামক রোগেরও অন্যতম কারণ এ বায়ুদূষণ।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউট (এইচইআই) ও দ্য ইনস্টিটিউট ফর হেলথ ম্যাট্রিক্স অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন (আইএইচএমই) প্রতি বছর বৈশ্বিক বায়ুমান প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ২০১৭ সালের তথ্যের ভিত্তিতে চলতি বছরের প্রতিবেদনটি সম্প্রতি প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, বাংলাদেশে ২০১৭ সালে বায়ুদূষণে মারা গেছে ১ লাখ ২৩ হাজার মানুষ, মোট মৃত্যুর যা ১৪ শতাংশ। এছাড়া বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশীদের আয়ু কমছে গড়ে ১ বছর ১০ মাস। গড় আয়ু কমার এ হার বিশ্বে সর্বোচ্চ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ও বায়ুদূষণ বিষয়ক গবেষক অধ্যাপক আবদুস সালাম বলেন, বাংলাদেশে বায়ুদূষণের মোট পরিমাণ চীন ও ভারতের সঙ্গে তুলনীয় নয়। তবে বিশ্বের যেসব দেশে সবচেয়ে দ্রুত বায়ুদূষণ বাড়ছে, তার মধ্যে অবশ্যই বাংলাদেশ প্রথম সারিতে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here